আজ- শুক্রবার, ১৫ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

একজন শিল্পীর জীবন..!

৬০ ও ৭০ দশকের পিরোজপুরের থানা রোডে স্টুডিও জেনিথ এবং ৮০ দশকে স্টুডিও প্যালেস ছিল এই শহরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ফটোগ্রাফীর বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। আর চন্দ্রকান্ত দেবনাথ ছিলেন তখনকার সাদা-কালো ছবি তোলার যাদুকর। তাঁকে বলা হতো এ শহরের নায়ক উত্তম কুমার। অনেক তরুণীর হার্টথ্রব ছিলেন চন্দ্র দা। পরিবার সদস্য স্ত্রী, সন্তানরা অনেক দিন আগে থেকে ভারত প্রবাসী। পৈতৃক সম্পত্তি রক্ষায় আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের সাথে মামলায় জড়িয়ে মাটি কামড়ে পড়েছিলেন নিজ ভিটায়। গতকাল বা পরশু রাতে কোন এক সময় এভাবেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করে চলে গেলেন পরপারে। মৃত্যুর সময় কেউ ছিলনা পাশে। রবিবার সকালে প্রতিবেশীরা তাঁকে খুঁজে পেলেন এক অকথ্য-অবর্ণনীয় অবস্থায়। হায়রে শিল্পী জীবন। তাঁর মৃত্যুর খবরে অনেকেই শোক জানিয়ে Nazrul Sabuj  লিখেছেন ,মর্মান্তিক! জীবনের শেষ সময়টা কার কীভাবে অতিক্রান্ত হয়, আমরা কেউই জানি না।Badol Haq লিখেছেন,  অত্যন্ত দুঃখ জনক মৃত্যু। মৃত্যু অনিবার্য কিন্তু সময়টা অনির্দিস্ট। তাই বলে মৃত্যুর সময় এভাবে একা একা কেউ নেই পাশে। এমনকি যে খাবার প্লেটে সামান্য খাবারও হয়তো সে খেয়ে যেতে পারেনি। আমি একজন শিক্ষক সেই সাথে আমার ফটোগ্রাফির ব্যবসাও আছে একজন কিংবদন্তী ফটোগ্রাফারের এমন মৃত্যুতে সত্যি বড্ড কষ্ট পেলাম।  Reza Karim লিখেছেন, চন্দ্রকান্ত দেবনাথ। আমাদের চন্দ্রদা। পিরোজপুর শহরের বাণিজ্যিক চিত্রগ্রাহকদের পথপ্রদর্শক। ৬০ এবং ৭০ দশকের কিশোর কিশোরীর বুকের কাঁপন। হার্টথ্রব। আমাদের শহরের উত্তমকুমার। সাদাকালো ছবিতে আলোছায়ার খেলায় সুনিপূন কারিগর। স্টুডিও জেনিথ থেকে স্টুডিও ভেনাস। তখনও রঙিন ছবি আসেনি।অথচ সাদাকালো ছবিতে কি এক যাদুকরী উপায় আলোছায়ার খেলায় জীবন্ত হয়ে যেতো ইয়াসিকা ক্যামেরায় তোলা স্থিরছবিগুলো। বন্ধু নাসিম, চান্নু এবং আমার একটা নিয়মিত সময় কাটতো চন্দ্রদার সান্নিধ্যে। কতো কথা, কতো গল্প সাথে সেকান্দারের রঙ চা। সুন্দর একটা পরিবার ছিলো। দুই ছেলে আর ছোটোখাটো গড়নের বৌদী। হঠাৎ একদিন শুনলাম বৌদী ছেলে দুটো নিয়ে কোলকাতা চলে গেছেন। লক্ষ্য করতাম সেই থেকে দাদার কেমন যেন মন মরা ভাব। তারা আর ফিরলোনা। প্রেমিক পুরুষ দাদা ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছিলেন। নীরব থেকে থেকে নিজের আগুনে পুড়ছিলেন নিজেই। তারপর অজানা কারনে স্টুডিও ব্যবসা গুটিয়ে নিলেন। এরমধ্যে দামোদরে অনেক পানি দুদিক গড়িয়ে বলেশ্বর ও কচা প্লাবিত করলো। চাকরির কারনে শহরের বাইরে কাটালাম অনেক দিন। বেশকিছু দিন পর দাদার সাথে দেখা হলো দামোদর পুলের কাছে সদ্য প্রতিষ্ঠিত স্টুডিও মুনের সামনে। কুশলাদি বিনিময়ের পর জানতে চাইলাম, কি করছেন আজকাল ? কিছুক্ষণ মৌন থেকে বললেন, এখানে বসি। বুঝতে বাকি রইলোনা যে, একদা মালিক আজ কর্মচারী। কাকতালীয় ভাবে আমাদের দুজনের জোড়া দীর্ঘশ্বাস একই সময়ে বুক খালি করে বেরিয়ে গেল। চাকরির শেষ সময়ে এসে জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাথে জড়িয়ে গেলাম। ২০১৬/১৭ সনের গুনীজন সম্বর্ধনা দেয়া হবে। অন্যান্যদের সাথে চন্দ্রদার নামটিও নির্বাচিত হলো। আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে বিশেষ এক মাহেন্দ্রক্ষণে গুনীজন হিসেবে সম্বর্ধিত হলেন চন্দ্রকান্ত দেবনাথ। আমাদের চন্দ্রদা। আজকে নাসিমের সাথে অনেক দিন পর দেখা ওর বাসার কাছে। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো দাদার মৃত্যুসংবাদটি শুনলাম নাসিমের মুখে। ওর অফিসে নিয়ে দাদার উপর্যুক্ত ছবিগুলো দেখালো। দেখলাম একসময়ের চিরযুবা সর্বদা হাসিখুশি প্রাণচাঞ্চল্য ভরা মানুষটি কী অবহেলায়, কী নিঃসঙ্গ ভাবে মৃত্যুর কোলে শুয়ে আছে। প্রায় কোটি টাকার সম্পত্তির মালি কী কপর্দকহীন চলে গেলেন। দাদা, মৃত্যুর কাছে মানুষ যে কতো অসহায় তা আপনার মৃত্যুদৃশ্য দেখে অনুধাবন করলাম, উপলব্ধি করলাম আমরা কতো ক্ষুদ্র। আপনি যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন। ক্ষমা করে দিন আমরা যারা মৃত্যুকে সামনে নিয়ে বেঁচে আছি।Nasir Uddin শিল্পীরা মরেনা,মানুষের মনি কোঠায় বেঁচে থাকে,তবে জীবন সায়হ্নে ধুকে ধুকে কষ্টপায়।ভাল থাকবে পরপারে এ কামনা করি। Swapan Mitra  লিখেছেন, চন্দ্রকান্ত দার বিদায়ী আত্মার শান্তি কামনা করি। খুব হাসি খুশী সুদর্শন পুরুষের কথা বলতে গেলে তার নামটা নিঃসন্দেহে চোখের সামনে ভেসে আসে। সবার সঙ্গে এমনভাবে ভাবে আন্তরিক ভাবে কথা বলতো যেন মনে হত খুব কাছের মানুষের সাথে কথা বলছি। আমাদের পরিবারের যৌথ ফটোর দিকে তাকালে চন্দ দার কথা মনে পড়ে যায়। Kabirul Islamলিখেছেন, আমার দেখা সেরাদের সেরা একজন ফটোগ্রাফার।আমার প্রথম ছবি তারই হাতের নিপুণ কারুকাজ। তার এ করুন মৃত্যু আমাকেও কাদায়।  MD Golam Mawla Nakib   লিখেছেন,  অনেক ছবি তুলেছি দাদার হাতে।খুব খারাপ লাগছে। Mizanur Rahman Mukul  লিখেছেন, He was a good soul and good friend. Dear Nasim, please advise if we could help in anything as Chandra Da, as we can guess, left in very helpless situation.  Mijanur Rhaman Milonলিখেছেন, চন্দ্র দা আমার একজন প্রিয়ভাজন মানুষ ছিলেন।এবং আমার জানা মতে খুবি ভাল মানুষ ছিল।সত্যি ওনার মৃত্যুতে আমি গভীর শোকাহত।আমি ওনার আত্তার শান্তি কামনা করি। Aslam Khan আমি ভীষণ মর্মাহত! ৮০’র দশকে গভীর সম্পর্ক ছিল তাঁর সাথে। প্রায়ই আড্ডা দিতাম তাঁর স্টুডিওতে। চা আর সিগারেট ছিল তাঁর সারক্ষণের সঙ্গী। অসম্ভব এক সম্মোহনী ক্ষমতা দিয়ে মানুষকে মুহূর্তেই কাছে টেনে নেবার বিরল গুণের অধিকারী ছিলেন। …মনে পড়ে জীবনের প্রথম ছবি- কলেজ ইলেকশানে(ছাত্র সংসদ) প্যানেল পরিচিতি বোর্ডে আমার ছবি তাঁর হাতেই তোলা। অনেক ছবি তুলেছি তাঁর স্টুডিওতে। শুধু সাদা-কালোই নয়, রঙীন ছবি’র যুগকেও তিঁনি রাঙিয়েছেন! তাঁর হাতে তোলা আমার কিছু সাদা-কালো আর রঙীন ছবি বোধহয় পুরোনো এলবামে আজও খুঁজে পাবো। …খুবই কষ্ট হচ্ছে তাঁর এই নিঃসঙ্গ-অসহায়ত্ব অকালপ্রায়াণে। সৃষ্টিকর্তা যেন যেন তাঁকে পরপারে ভাল রাখেন। এছাড়া অসংখ্যা চন্দ্র কান্ত দেবনাথের ভক্তরা তাদের স্মৃতির কথা উল্লেখ করে তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করেছেন। 

দৈনিক ইত্তেফাকের, ষ্টাফ রিপোর্টার - মুনিরুজ্জামান নাসিম আলীর ফেসবুক পোষ্ট থেকে নেয়া । 

বিভাগ: অন্যান্য,জাতীয়,টপ নিউজ,ফিচার,বরিশাল বিভাগ,ব্রেকিং নিউজ,মিডিয়া,সারাদেশ