আজ- সোমবার, ১১ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

এরশাদের বর্ণাঢ্য জীবন

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত ভারতের কুচবিহারের দিনহাটায় জন্মগ্রহণ করেন। চার ভাই পাঁচ বোনের মধ্যে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ছিলেন মেজ। পরিবারে তার নাম ছিল পেয়ারা। তার শৈশব ও স্কুলজীবন কেটেছে বাবা-মার সঙ্গে দিনহাটায়। সেখান থেকেই তিনি এসএসসি পাস করেন।

পরে তিনি রংপুরে কারমাইকেল কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পড়েন। দেশভাগের পর ১৯৫০ সালে তার বাবা মকবুল হোসেন স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে চলে আসেন রংপুরে। ওই বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন এরশাদ।

উকিল হওয়ার আশায় এরপর তিনি ল’ কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। তবে আইন পড়া শেষ করার আগেই ১৯৫২ সালে সেনাবাহিনীতে অফিসার পদে যোগ দেন।

এরশাদ ১৯৬০-৬২ সালে চট্টগ্রাম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কেন্দ্রে অ্যাডজুট্যান্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৬৬ সালে তিনি কোয়েটার স্টাফ কলেজ থেকে স্টাফ কোর্স সম্পন্ন করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি শিয়ালকোটে ৫৪ ব্রিগেডের মেজর হন।

১৯৬৯ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে পদোন্নতি লাভের পর ১৯৬৯-৭০ সালে তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক এবং ১৯৭১-৭২ সালে ৭ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

পাকিস্তান থেকে দেশে ফেরার পর ১৯৭৩ সালে এরশাদ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯৭৩ সালের ১২ ডিসেম্বর কর্নেল ও ১৯৭৫ সালের জুনে ব্রিগেডিয়ার পদে পদোন্নতি পান।

১৯৭৫ সালের ২৪ আগস্ট ভারতে ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে প্রশিক্ষণরত অবস্থায় তিনি মেজর জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি ও উপ-সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে এরশাদকে সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ১৯৭৯ সালে তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি প্রধান সামরিক প্রশাসক হিসেবে দেশ শাসন করেন। এরশাদ দেশে উপজেলা পদ্ধতি চালু করেন এবং ১৯৮৫ সালে প্রথম উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৮৬ সালে তিনি জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন এবং এ দলের মনোনয়ন নিয়ে একই বছর ৫ বছরের জন্য দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত অংশ নেয়। তবে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে। সাধারণ নির্বাচনে এরশাদের দল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পায়। বিরোধী দলের আন্দোলনের মুখে ৭ ডিসেম্বর ১৯৮৭ সালে তিনি এ সংসদ বাতিল করেন। অবশ্য ১৯৮৮ সালের সাধারণ নির্বাচন সব দল বর্জন করে।

১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির পদ থেকে এরশাদ পদত্যাগ করেন। ক্ষমতা হারানোর পর তিনি গ্রেফতার হন। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি কারাগার থেকে নির্বাচনে অংশ নেন এবং রংপুরের পাঁচটি আসন থেকে নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনেও তিনি পাঁচটি আসন থেকে নির্বাচিত হন। ৬ বছর অবরুদ্ধ থাকার পর ১৯৯৭ সালের ৯ জানুয়ারি তিনি জামিনে মুক্তি পান।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তার দল জাতীয় পার্টি সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং তার স্ত্রী রওশন এরশাদ প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা হন। দশম জাতীয় সংসদেও এরশাদ সদস্য ছিলেন। ওই সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূতের দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমান একাদশ জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন তিনি।

ছাত্রজীবনে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলাতেও মনোযোগ ছিল এরশাদের। ফুটবলের প্রতি ছিল বিশেষ আগ্রহ। স্কুল ও কলেজ জীবনে তিনি রংপুর অঞ্চলে বিভিন্ন ক্লাবে ভাড়ায় ফুটবল খেলতেন। পাশাপাশি কবিতা লিখতেন তিনি। কারমাইকেল কলেজের সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করেছিলেন। তার এ কবিতা লেখা অব্যাহত ছিল কর্মজীবনেও।

৯ বছরের শাসনামল : রাষ্ট্রপতি থাকাকালে ৯ বছরে দেশে উন্নয়নের ভিত রচনা হয় এরশাদের হাতে। তার স্লোগান ছিল, ‘৬৮ হাজার গ্রাম বাঁচলে দেশ বাঁচবে’। এরশাদ রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেন। মসজিদের বিল মওকুফ করেন, সরকারি ছুটি শুক্রবার প্রবর্তন করেন।

উপজেলা পদ্ধতি প্রবর্তনের মাধ্যমে প্রশাসনিক ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করেন এরশাদ। উপজেলা ভবন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ ও উপজেলায় ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ হয় তার সময়ে। এ ভূমিকার কারণে তিনি ‘পল্লীবন্ধু’ খেতাবে ভূষিত হন। জেলা পরিষদ সক্রিয় ও কার্যকর করেন তিনি।

উচ্চ আদালতে বিচারের জন্য যাতে ঢাকায় আসতে না হয় এজন্য হাইকোর্টের ছয়টি বেঞ্চকে ঢাকার বাইরে স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন এরশাদ। কিন্তু আইনজীবীদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত সেটি বাস্তবায়ন করতে পারেননি।

এরশাদ শিল্পে ব্যক্তি খাতের বিকাশে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন। শিল্পনীতি ঘোষণার পর বিনিয়োগ বোর্ড প্রতিষ্ঠা করেন। পোশাক শিল্প তার সময়ে বিকশিত হয়। ঢাকায় প্রথম বেবি হোম তার অনুপ্রেরণায় তৈরি হয়। তিনি ঔষধ নীতি প্রণয়ন করেন। ফলে ঔষধের দাম যেমন কমে আসে, তেমনি স্থানীয় কোম্পানিগুলো ঔষধ উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করে।

উত্তরবঙ্গসহ সারা দেশে যোগাযোগ অবকাঠামো তার হাতেই গড়ে উঠে। এরশাদই প্রথম যমুনা সেতু নির্মাণের বাস্তব পদক্ষেপ নেন। বুড়িগঙ্গা, কাঞ্চন, হালদা, মেঘনা-গোমতী, কর্ণফুলী, রূপসা, ২য় বুড়িগঙ্গা সেতুসহ ৪৩টি বড় সেতু গড়েন তিনি। দেশে প্রথম বিরতিহীন আন্তঃনগর ট্রেন চালু করেন তিনি।

পথশিশুদের প্রয়োজন মেটাতে গঠন করেন ‘পথকলি ট্রাস্ট’। ঘূর্ণিঝড় প্রবণ এলাকায় প্রথম শেল্টার বাড়ি নির্মাণ করেন তিনি। গুচ্ছগ্রামের (বর্তমানে আশ্রয়ণ) ধারণা তিনি প্রবর্তন করেন। তিস্তা বাঁধ তৈরি করে উত্তরের সাত জেলায় সেচ সুবিধা নিশ্চিত করেন।

এরশাদের আমন্ত্রণে রানী এলিজাবেথ ও চীনের প্রেসিডেন্ট প্রথম এদেশে আসেন। তার শাসনকালে বিশ্বের প্রভাবশালী প্রেসিডেন্টরা এদেশে আগমন করেন। তিনি আমেরিকার হোয়াইট হাউসে বাংলাদেশের পক্ষে ভাষণের সুযোগ পেয়েছিলেন। জাতিসংঘের শান্তি মিশনে প্রথম সেনা পাঠান তিনি।

জাতীয় সংসদ ভবনের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করেন তিনি। জাতীয় স্মৃতিসৌধের নির্মাণ সম্পন্ন করেন। পুরনো বিমানবন্দরে প্যারেড স্কয়ার নির্মাণ হয় তার সময়ে। তিনি বাংলাদেশে প্রথম আইএসডি টেলিফোন প্রতিষ্ঠা করেন। তার শাসনামলে দেশে প্রথম সার্ক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। শিল্পকলা একাডেমির বর্তমান আধুনিক ডিজাইনের রূপকার তিনি। রাজশাহী বিমানবন্দর চালু হয় তার সময়ে। ওয়ারীতে সুইপারদের জন্য বহুতল ভবন নির্মাণ করেন তিনি। তার সময়ে নির্মিত হয় মতিঝিল সেনাকল্যাণ ভবন।

গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম তার সময় বিস্তৃতি লাভ করে। বারডেম হাসপাতাল তার সময় প্রতিষ্ঠা পায়। রাজশাহীর বরেন্দ্র গবেষণা তার হাতে নির্মিত। গাজীপুরে ধান ও চাল গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। সিলেটের ওসমানী মেডিকেল হাসপাতাল, ওসমানী বিমানবন্দরসহ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় তার হাতে তৈরি।

মুজিব নগর স্বাধীনতা সৌধ নির্মাণ, ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বর্তমান আদলে ফিরে আসার সূচনা তার সময়ে। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম মসজিদের সংস্কারেও তার অবদান রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তিন নেতার স্মৃতিসৌধ তৈরি করেন তিনি। ‘ডাক্কা’ কে ‘ঢাকা’ নামকরণ করেন এরশাদ। ঢাকা শহর রক্ষা বাঁধ (বেড়িবাঁধ) নির্মাণ করেন তিনি। সুপ্রিমকোর্ট মাঠে ঈদের জামাত তিনিই প্রথম শুরু করেন।

ওসমানী মিলনায়তন এরশাদের আমলে তৈরি। উত্তরা ও বারিধারা হাউজিং উন্নয়ন ও প্লট বরাদ্দ করেন তিনি। সায়েদাবাদ, গাবতলী ও তেজগাঁওয়ে বাস টার্মিনাল তৈরি করেন। ঢাকায় ডজনেরও বেশি শিশুপার্ক নির্মাণ করেন তিনি। ঢাকায় আধুনিক রোড ও ট্রাফিক সিগন্যাল তিনি প্রথম স্থাপন করেন। ঢাকায় গরুর গাড়ি দিয়ে ময়লা ফেলার পরিবর্তে ট্রাক চালু করেন তিনি।

চট্টগ্রাম বন্দরে প্রথম ৯ মিটার ড্রাফটের জাহাজের জন্য জেটি ও ৫টি নতুন শেড বানিয়েছিলেন তিনি। বিআইডব্লিউটিএ এবং বিআইডব্লিউটিসির মাধ্যমে দেশের নদীপথ ও স্টিমার সার্ভিসের আধুনিকায়ন করেছেন এরশাদ। সারা দেশের গ্রামগঞ্জে পাকা রাস্তা করার জন্য এলজিইডি সৃষ্টি করেছেন।

বিভাগ: অন্যান্য,জাতীয়,টপ নিউজ,ঢাকা বিভাগ,তথ্য প্রযুক্তি,ফিচার,ব্রেকিং নিউজ,মিডিয়া,রাজনীতি,সারাদেশ