আজ- শুক্রবার, ২৪শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৯ই ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

২৫ মার্চের কালরাতে যা ঘটেছিল

আজ ভয়াল ২৫ মার্চ, জাতীয় গণহত্যা দিবস। দিনটির স্মরণে জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এ উপলক্ষে আজ সোমবার রাত ৯টা থেকে ৯টা ১ মিনিট পর্যন্ত ১ মিনিটের জন্য জরুরি স্থাপনা ও চলমান যানবাহন ব্যতীত সারাদেশে প্রতীকী ব্ল্যাকআউট কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।

স্কুল, কলেজ এবং মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কণ্ঠে ২৫ মার্চ গণহত্যার স্মৃতিচারণা ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে গণহত্যার ওপর দুর্লভ আলোকচিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে।

২৫ মার্চের গণহত্যা শুধু এক রাতের হত্যাকাণ্ডই ছিলনা, এটা ছিল মূলত বিশ্ব সভ্যতার জন্য এক কলংকজনক জঘন্যতম গণহত্যার সূচনা মাত্র। অস্ট্রেলিয়ার ‘সিডনি মর্নিং হেরাল্ড’ পত্রিকার ভাষ্য মতে শুধুমাত্র ২৫ মার্চ রাতেই বাংলাদেশে প্রায় ১ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, যা গণহত্যার ইতিহাসে এক জঘন্যতম ভয়াবহ ঘটনা। পরবর্তী নয় মাসে একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার লক্ষ্যে ৩০ লক্ষ নিরপরাধ নারী-পুরুষ-শিশুকে হত্যার মধ্য দিয়ে বর্বর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা পূর্ণতা দিয়েছিল সেই ঘৃণ্য ইতিহাসকে। তাদের সংঘটিত গণহত্যা, ধর্ষণ, লুন্ঠন, অগ্নিসংযোগ সবই ১৯৪৮ সালের ১১ ডিসেম্বর জাতিসংঘ গৃহীত ‘জেনোসাইড কনভেনশন’ শীর্ষক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে বর্ণিত সংজ্ঞায় গণহত্যার চুড়ান্ত উদাহরণ।

মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন ২৫ মার্চের রাত সর্ম্পকে লিখেছেন, ‘সে রাতে ৭০০০ মানুষকে হত্যা করা হয়, গ্রেফতার হয় আরও ৩০০০ লোক। ঢাকায় ঘটনার শুরু মাত্র হয়েছিল। তৎকালীন সমস্ত পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে সৈন্যরা বাড়িয়ে চললো মৃতের সংখ্যা। জ্বালাতে শুরু করলো ঘর-বাড়ি, দোকান-পাট লুট। আর ধ্বংস তাদের নেশায় পরিণত হলো যেন। রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা মৃতদেহগুলো কাক-শেয়ালের খাবারে পরিনত হলো। বাংলাদেশ হয়ে উঠলো শকুন তাড়িত শ্মশান ভূমি।’

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বলা হয়, ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে জয়লাভ করা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের কাছে পাকিস্তানী জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তর না করার ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের প্রক্রিয়া চলাকালে পাকিস্তানী সেনারা কুখ্যাত ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নাম দিয়ে নিরীহ বাঙালী বেসামরিক লোকজনের ওপর গণহত্যা শুরু করে। তাদের এ অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগসহ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতা-কর্মীসহ সকল সচেতন নাগরিককে নির্বিচারে হত্যা করা।

অপারেশন সার্চলাইটে বাঙালীদের কমপক্ষে এক প্রজন্মকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার পরিকল্পনা ছিলো। বর্বরতাকেও ছাড়িয়ে যাওয়া ২৫ মার্চের কালরাতের নিষ্ঠুরতার প্রস্তাব করা হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। ওইদিন পশ্চিম পাকিস্তানে পাকি সশস্ত্র বাহিনীর এক বৈঠকে এই অপারেশনের প্রস্তাব করা হয়। আর মার্চের ১৭ তারিখে জেনারেল হামিদ টেলিফোন করে আরেক জেনারেল খাদিম হোসেন রাজাকে এই ভয়াবহ অপারেশনের পরিকল্পনা করার দায়িত্ব দেয়। ১৮ মার্চ সকালে ঢাকা সেনানিবাসের জিওসি কার্যালয়ে বসে জেনারেল রাজা ও কুখ্যাত মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী অপারেশনের মূল পরিকল্পনা তৈরি করেন। পরিকল্পনাটি জেনারেল ফরমান নিজ হাতে হালকা নীল রঙের একটি অফিস প্যাডের ৫ পাতা জুড়ে লিড পেন্সিল দিয়ে লেখেন বলে বিভিন্ন গবেষণা দলিলে উঠে এসেছে।

মূলত রাজনৈতিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নেতৃত্ব প্রদানকারী বাঙালীদের একটি প্রজন্মকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার পরিকল্পনা করা হয় অপারেশন সার্চলাইটে। ওই পরিকল্পনার ছয়টি লক্ষ্য ছিল। ১। সারা পূর্ব পাকিস্তানে একযোগে অপারেশন শুরু করতে হবে। ২। সর্বোচ্চ সংখ্যক রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠনের নেতা, সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিবর্গ এবং শিক্ষকদের গ্রেফতার করতে হবে। ৩। ঢাকায় অপারেশন ১০০ ভাগ সফল হতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দখল এবং তল্লাশি করতে হবে। ৪। সেনানিবাসকে সুরক্ষিত রাখার প্রয়োজনে যতো অস্ত্র দরকার ব্যবহার করা হবে। ৫। টেলিফোন, টেলিভিশন, রেডিও ও টেলিগ্রাফসহ সকল অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে এবং ৬। অস্ত্র ও গোলাবারুদ কেড়ে নিয়ে সকল পূর্ব পাকিস্তানী (বাঙালী) সৈন্যদলকে নিষ্ক্রিয় করে দিতে হবে।

১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে এদেশের মানুষ তাদের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর তার দল আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়। তাদের স্বপ্ন ছিল অত্যাচারী পাকিস্তানী সেনাশাসনের বদলে এদেশে আওয়ামী লীগ ৬ দফা অনুসারে সরকার গঠন করবে। কিন্তু পাকিস্তান সেনাবাহিনী মনে করে, বাঙালীদের হাতে ক্ষমতা দেয়া মানে পূর্ব পাকিস্তান হাতছাড়া হয়ে যাওয়া। তাই যে কোন মূল্যে পূর্ব পাকিস্তানকে দখলে রাখার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। তারা বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা দেয়ার বদলে তাদের হত্যা করার নীল নক্সাই চূড়ান্ত করে।

বাঙালীদের হত্যার এই নীল নক্সার প্রমাণ পাওয়া যায় পরাজিত পাকিস্তানী বাহিনীর অধিনায়ক নিয়াজির ‘বিট্রায়াল অব ইস্ট পাকিস্তান’ গ্রন্থে। নিয়াজি তার পূর্বসূরী জেনারেল টিক্কা খান প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তার বাইতে উল্লেখ করেছেন টিক্কা তার অধীন পাকিস্তানী সেনাদের বলেছিলেন, ‘আমি মাটি চাই, মানুষ চাই না।’

পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে ৪৫ মিনিটি ধরে বৈঠক করেন। রংপুর, সৈয়দপুর ও চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর গুলিতে ১১ জন নিহত হওয়ার সংবাদ পাওয়া যায়। সেনাবাহিনীর এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু ২৭ মার্চ সারা দেশে হরতাল আহ্বান করেন। দুপুরের পর থেকেই ঢাকাসহ সরারদেশে থমথমে অবস্থা বিরাজ করতে থাকে। এদিন সকাল থেকেই সেনা কর্মকর্তাদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মত। হেলিকপ্টার যোগে তারা দেশের বিভিন্ন সেনানিবাস পরিদর্শন করে বিকেলের মধ্যে ঢাকা সেনানিবাসে ফিরে আসে।

ঢাকার ইপিআর সদর দফতর পিলখানাতে অবস্থানরত ২২তম বালুচ রেজিমেন্টকে পিলখানার বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিতে দেখা যায়। এদিন মধ্যরাতে পিলখানা, রাজারবাগ, নীলক্ষেত আক্রমণ করে পাকিস্তানি সেনারা। হানাদার বাহিনী ট্যাঙ্ক ও মর্টারের মাধ্যমে নীলক্ষেতসহ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা দখল নেয়। সেনাবাহিনীর মেশিনগানের গুলিতে, ট্যাঙ্ক-মর্টারের গোলায় ও আগুনের লেলিহান শিখায় নগরীর রাত হয়ে উঠে বিভীষিকাময়।

এদিন পাকিস্তানি হায়েনাদের কাছ থেকে রক্ষা পায়নি রোকেয়া হলের ছাত্রীরাও। ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব ও জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য, ড. মনিরুজ্জামানসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ৯ জন শিক্ষককে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। ঢাবির জগন্নাথ হলে চলে নৃশংসতম হত্যার সবচেয়ে বড় ঘটনাটি। এখানে হত্যাযজ্ঞ চলে রাত থেকে সকাল পর্যন্ত।

বিশিষ্ট নজরুল গবেষক ও বাংলা একাডেমির সাবেক পরিচালক অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম থাকতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নীলক্ষেত আবাসনের ২৪নং বাড়িতে। ওই বাড়ির নিচে দু’পায়ে গুলিবিদ্ধ দুইমা তাদের শিশু সন্তানকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সিঁড়ি ভেসে যাচ্ছিল তাদের রক্তে। পাক হানাদাররা ভেবেছিল অন্য কোন দল হয়ত অপারেশন শেষ করে গেছে। তাই তারা আর ওই বাড়িতে ঢোকেনি। অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম তখন প্রাণে বেঁচে যান। পরে এ নিয়ে স্মৃতিচারণ করে লিখেন অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম।

তিনি বলেন, তাদের বাড়ির নিচে আর একজন অবাঙালী অধ্যাপক থাকলেও তিনি ২৫ মার্চের আগে কাউকে না জানিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যান। শুধু তাই নয়- বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকার সব অবাঙালী পরিবার তাই করেছিলেন। এ থেকেই ধারণা করা যায়-২৫ মার্চের এই হত্যাযজ্ঞের পূর্বাভাস অবাঙালীরা জানতো।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান অপারেশন সার্চ লাইট পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সকল পদক্ষেপ চূড়ান্ত করে গোপনে ঢাকা ত্যাগ করে করাচি চলে যান। সেনা অভিযানের শুরুতেই হানাদার বাহিনী বাঙালী জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের আগে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং শেষ শত্রু বিদায় না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাবার আহ্বান জানান।

‘৭১-এর ১ মার্চের পর পূর্ব পাকিস্তানের চালচিত্র দ্রুত পাল্টাতে থাকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চ বিকেলে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে দশ লক্ষাধিক লোকের অভূতপূর্ব রেসকোর্স ময়দানে দশ লক্ষাধিক লোকের অভূতপূর্ব সমাবেশে ভাষণ দেন। ২৬ মিনিটের ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ছিল মূলত বাঙালীদের স্বাধীনতা সংগ্রামের শাশ্বত প্রেরণার উৎস। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা সংগ্রামের আহ্বান জানিয়েই ক্ষান্ত হননি। তিনি অহিংস, অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচী দেন, যা বাংলাদেশের সর্বত্র স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হতে থাকে। তিনি বেসামরিক প্রশাসন চালু করার জন্য ৩৫টি বিধি জারির ঘোষণা দেন। ফলে ৭ মার্চ থেকে পূর্ব বাংলা মূলত তার নির্দেশেই চলতে থাকে।

শেখ মুজিবের ‘অহিংস-অসহযোগ’ আন্দোলনের শক্তি এমনই ছিল যে, ঢাকা সেনানিবাস তখন থেকেই পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এমনকি ঠিকাদারেরাও তাদের খাবার সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

পরিকল্পনায় পূর্ব নির্ধারিত আক্রমণাত্মক অপারেশন পরিচালনার জন্য চিহ্নিত স্থানগুলো ছিল- ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর, রাজশাহী, রংপুর, সৈয়দপুর এবং সিলেট। এজন্য এসব স্থানে পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যও বেশি বেশি করে জমা করা হলো। পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য স্থানে অবস্থিত সৈন্যদল এবং প্যারা মিলিটারি বাহিনী তাদের নিজ নিজ এলাকা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে থেকে যাবে এবং প্রয়োজন হলে অন্যান্য স্থানে প্রাথমিক অপারেশনের সময় শক্তি বৃদ্ধির উদ্দেশে যোগ দেবে। ঢাকা সম্পূর্ণ নিরাপদ হলে পাকিস্তানের ৯ম এবং ১৬তম ডিভিশনের সৈন্যরা শক্তিবৃদ্ধির জন্য বিমান যোগে ঢাকা চলে আসবে।

আলোচনার আড়ালে ইয়াহিয়া খান সামরিক অভিযানের প্রস্তুতির খবর নেন। অভিযানের প্রস্তুতি হিসাবে মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলির নির্দেশে ২৫ মার্চ সকালে পিলখানার নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়ে নেয় পাকিস্তানি সেনারা। তখন বাঙালী ইপিআর অফিসারদের পাকিস্তানী অফিসাররা পিলখানায় নানাভাবে ব্যস্ত রাখে এবং সৈন্যদের প্রায় সবাইকেই কাজ বন্ধ রেখে বিশ্রামে পাঠানো হয়। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে গ্রীন সিগনাল পাওয়ার পর ২৫ মার্চ বিকেলে ইচ্ছে করেই ইয়াহিয়া খান রাজনৈতিক সমাধানের পথ বন্ধ করে দিয়ে আলোচনা ব্যর্থ করে দেন। কারণ আলোচনার টেবিলে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকটের সমাধান করতে হলে নির্বাচনে দলের নেতা বঙ্গবন্ধুর কাছে পাকিস্তানের ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। যেহেতু আওয়ামী লীগ তথা পূর্ব পাকিস্তানের কোন রাজনৈতিক দলের কাছে সামরিক জান্তারা ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। তাই তারা পরিকল্পনা মোতাবেক আলোচনা ব্যর্থ করে দেন।

আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ইয়াহিয়া খান আর ঢাকায় অবস্থান করেননি। তিনি সন্ধ্যা পৌনে ছয়টায় প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে সরাসরি এয়ারপোর্টে চলে যান। রাত পৌনে আটটায় তিনি গোপনে বিমান যোগে ঢাকা ত্যাগ করেন। ইয়াহিয়া খান ঢাকা ত্যাগের প্রাক্কালে পূর্ব বাংলায় নিরপরাধ বাঙালীদের ওপর কাপুরুষোচিত সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি শুধু বাংলার মাটি চাই, মানুষ নয়।’

সন্ধ্যার পরপরই সারা শহরে গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয় ‘ইয়াহিয়া খান ঢাকা ছেড়ে চলে গেছে’। তখন আওয়ামী লীগের স্বেচ্ছাসেবকরা রাস্তায় রাস্তায় হালকা ব্যারিকেড বসানো শুরু করে। কিন্তু এই সব প্রতিবন্ধকতা পাকিস্তানী সৈন্যদের ভারি ভারি অস্ত্রশস্ত্র ও সাঁজোয়া যানের কাছে পাত্তাই পায় না। যেসব স্বেচ্ছাসেবকরা রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা স্থাপন করছিল উল্টো তারাই প্রথম সৈন্যদের আক্রমণের শিকার হয় এবং পাকিস্তানী জান্তারা তাদের হত্যা করে।

যদিও অপারেশন রাত ১১টায় শুরু হবার কথা, পাকিস্তানী সৈন্যরা সাড়ে ১১টায় ঢাকা সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে আসে। কারণ পাকিস্তানী ফিল্ড কমান্ডার চাইছিলেন যে বাঙালী সৈন্যরা যাতে কোন বাধা দিতে না পারে। সেনাবাহিনীকে পুরো অপারেশনের জন্য ৬ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেয়া হয়েছিল। পাকিস্তানী সৈনরা আক্রমণ শুরু করার আগে আগেই দ্রুততার সঙ্গে ঢাকা শহরের সকল যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

১০ম বেঙ্গল রেজিমেন্টকে সেনানিবাসে পাকিস্তানীরা সহজেই নিরস্ত্র করে দেয় এবং তাদের হত্যা করে। ৩১তম ফিল্ড রেজিমেন্টকে ঢাকার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ এলাকা এবং শহরের উত্তরাংশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেয়া হয়। মেজর বেলাল এবং লে. কর্নেল জেড এ খানের সঙ্গে নিযুক্ত কমান্ডো বাহিনী অপারেশনের শুরুতেই শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে। বঙ্গবন্ধুকে রাত দেড়টায় তার বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পাকিস্তানী সৈন্যরা। কিন্তু আওয়ামী লীগের বেশিরভাগ বড় নেতাই পাকবাহিনীর চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

বালুচ রেজিমেন্টটি ইপিআর সদর দফতরে অবস্থিত নিরস্ত্র আর অসংগঠিত ইপিআর সৈন্যদের আক্রমণ করে। সেখানে বাঙালী অসীম সাহসী যোদ্ধারা সারা রাত যুদ্ধ করে সুসজ্জিত পাকবাহিনীকে আটকে রাখে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সকালের দিকে তারা হেরে যায়। তাদের বেশিরভাগই সেখানে মারা যান এবং বাকিরা পালিয়ে যান। পাকিস্তানী বাহিনী এক রকম কোনো বাধা ছাড়াই মিরপুরে অবস্থানরত ইপিআর বাহিনীকে গ্রেফতার এবং রাষ্ট্রপতি ভবন ও গবর্নর হাউস দখল করে নেয়। এখানেও অনেক বাঙালী পালাতে পারলেও বেশিরভাগই মারা যান।

পাঞ্জাব রেজিমেন্টের দুটি অনিয়মিত বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা আক্রমণ করে। ছাত্ররা আর আওয়ামী লীগের স্বেচ্ছাসেবীরা তাদের বাধা দেয়ার চেষ্টা করলেও তারা পাকবাহিনীর হাতে মারা যান। প্রত্যেকটি হলে ঢুকে নিরস্ত্র ছাত্রদের খুঁজে বের করে হত্যা করে সেনা সদস্যরা। একই সঙ্গে হত্যা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু অগ্রগণ্য শিক্ষককেও।

রাজারবাগে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যরা স্বেচ্ছাসেবী ও স্থানীয় মানুষের সহায়তায় পাক জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু পাকিস্তানীদের ভারি অস্ত্রশস্ত্রের কাছে তারাও শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়। যারা বেঁচে যায় তাদের বেশিরভাগই ধরা পড়েন অথবা এদিক সেদিক পালিয়ে যান। ২৬ মার্চ সকালে সেনা সদস্যরা হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা এবং পুরান ঢাকা আক্রমণ করে।

ভোরের মধ্যে ঢাকা শহর আক্রমণকারীদের দখলে চলে যায়। এরপর খুনীরা শহরজুড়ে কারফিউ জারি করে। বেঁচে যাওয়া পুলিশ এবং ইপিআর সেনারা শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়, কেউ কেউ বুড়িগঙ্গা নদী পার হয়ে জিঞ্জিরায় গিয়ে সংগঠিত হতে থাকেন।

শুধু হত্যা আর গ্রেফতারই নয়, হায়েনারা শহীদ মিনার, দৈনিক ইত্তেফাকের কার্যালয়, ডেইলি পিপলসের কার্যালয় আর রমনার কালী মন্দিরও ধ্বংস করে দেয়। ধরা পড়া বাঙালী সৈন্য এবং ইপিআর ও পুলিশ কর্মকর্তাদের হয় মেরে ফেলা হয় নয়তো কোন বিচার ছাড়াই জেলখানায় বন্দী করা হয়। এই অপারেশন চলতে থাকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত।

অপারেশন সার্চলাইটে ঠিক কত লোক মারা পড়েন তার সঠিক কোন হিসাব নেই। তবে বিভিন্ন গবেষণায় ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞের কালরাতে কয়েক লাখ বাঙালীকে বর্বর কায়দায় হত্যা করা হয়েছিল বলে জানা যায়।

ঐতিহাসিকভাবে এটা ছিল বৈধ দাবির সপক্ষে বাঙালীর কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য সেনা অভিযান। জেনারেল এ এ কে নিয়াজি নিজেই স্বীকার করেছেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতের নিষ্ঠুরতা চেঙ্গিস খান ও হালাকু খানের বর্বরতাকেও ছাড়িয়ে গেছে। পরাজিত পাকিস্তানী বাহিনীর অধিনায়ক তার ‘বিট্রায়াল অব ইস্ট পাকিস্তান’ গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন, ‘২৫ মার্চের সামরিক অভিযান বুখারা ও বাগদাদে চেঙ্গিস খান ও হালাকু খানের গণহত্যার চেয়েও বেশি নিষ্ঠুর ছিল।’

নিয়াজি অবশ্য তার লেখা বইয়ে এ বর্বরতার জন্য পূর্বসূরী জেনারেল টিক্কা খানকে দায়ী করেছেন। টিক্কা খানই নাকি তার অধীন পাকিস্তানী সেনাদের বলেছিলেন, ‘আমি জমি চাই, মানুষ চাই না।’ আসলে এ নির্দেশটি ছিল ইয়াহিয়া খানের। ইয়াহিয়া খানই ঢাকা ত্যাগের প্রাক্কালে পূর্ব বাংলায় নিরপরাধ বাঙালীদের ওপর কাপুরুষোচিত সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি শুধু বাংলার মাটি চাই, মানুষ নয়।’

নিয়াজি পরে ঢাকায় পাকিস্তানী বাহিনীর অধিনায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করেন বলে তিনি ওই বর্বরতা প্রত্যক্ষ করেননি বলে দাবি করেন। তবে সে সময় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর তৎকালীন জনসংযোগ কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিক একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে ওই কালরাতের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি এটাকে ‘হলোকাস্ট’ বলে অভিহিত করেছেন।

সিদ্দিক সালিক লিখেছেন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান এবং তার স্টাফ ওই রাতে (২৫ মার্চ) দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবে পরিচিত বর্তমান শেরেবাংলানগরে অতিবাহিত করেন। ঢাকায় এবং বাইরে অভিযানের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্যই তারা যেখানে অবস্থান করেন। তিনি স্মরণ করেন, ‘ঢাকায় সেই রাত ছিল বসন্তের রাতের মতোই আনন্দময়। একটি রক্তাক্ত ‘হলোকাস্ট’-এর জন্য সবকিছু প্রস্তুত ছিল।’

সিদ্দিক সালিক তার ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ বইতে আরও লিখেছেন ‘সামরিক অভিযান শুরু হওয়ায় নরকের দরজা খুলে গিয়েছিল।’ বারান্দা থেকে তিনি চার ঘন্টা ধরে সেসব ভয়াবহ দৃশ্য দেখেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘সেই রক্তাক্ত রাতের দৃশ্যই ছিল এ রকম ধোঁয়ার কালো মেঘ ও উর্ধমুখী অগ্নিশিখা আকাশের দিকে ধাবিত হচ্ছিল। এ সময় উজ্জ্বল আগুন তার ঝলকানিকে ছাড়িয়ে আকাশের তারাগুলোকে স্পর্শ করতে চাচ্ছিল।’ ‘পরের দিন ভুট্টো যখন মন্তব্য করলেন সামরিক অভিযানের কারণে পাকিস্তান রক্ষা পেয়েছে, তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গণকবরের খোঁজ করছিলাম। সেখানে অমি পাঁচ থেকে পনেরো মিটার দীর্ঘ তিনটি গর্ত দেখতে পাই। সেগুলো ছিল মৃতদেহে পরিপূর্ণ।’

গণহত্যা সম্পর্কে অনুসন্ধান শেষে সিদ্দিক সালিক ২৬ মার্চ দুপুরে সেনানিবাসে ফিরে আসেন দুপুরের খাবারের জন্য। সেখানে তিনি দেখতে পান যথেষ্ট অন্যরকম পরিস্থিতি। যেন নগরীতে এই শোকাবহ ঘটনা সামরিক বাহিনীতে কর্মরত এবং তাদের ওপর নির্ভরশীলদের স্নায়ুবিক চাপ দূর করে দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘অফিসার্স মেসে ফূর্তিরত কর্মকর্তারা মুক্ত বায়ুতে শ্বাস নেয়ার মতো করে বিশ্রাম নিচ্ছিল। কমলার খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে জনৈক ক্যাপ্টেন চৌধুরী বলেন, বাঙালীদের ভালভাবে বাছাই করা হয়েছে, কমপক্ষে এক প্রজন্মের জন্য।’ আরেকজন কর্মকর্তা মেজর মালিক বলেন, ‘হ্যাঁ, তারা শুধুমাত্র বলপ্রয়োগের ভাষাই বোঝে। ইতিহাস তাই বলে।’

কিন্তু এটা তাদের জানা ছিল না যে, কিভাবে তারা মাত্র নয় মাস পরে ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালে ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। বাংলার কসাই নামে পরিচিত খুনী টিক্কা খানের ধারণা ছিল ১০-১৫ দিনের মধ্যেই এসব হামলায় ভয় পেয়ে বাঙালীরা লেজ গুটিয়ে বলবে, ‘ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি।’ কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাঙালীরা ওদের কেমন ‘বাংলার ক্যাদোর মইদ্যে শুয়াইয়া গাব্বুর মাইর দিলো’, সে গল্প কে না জানে!

বিভাগ: জাতীয়,ব্রেকিং নিউজ,সারাদেশ