আজ- বুধবার, ২৭শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

spot_img

পরীক্ষা যুদ্ধে পরাজিত শিক্ষার্থীর কথাও ভাবুন : মোঃ তারিকুল ইসলাম

 

প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীর জীবনে এইচএসসি বা সমমানের পরীক্ষা তার শিক্ষা জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কারণ এই পরীক্ষার ফলাফলের উপর নির্ভর করে একজন শিক্ষার্থীর উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের বিষয়টি। আর এই পরীক্ষার যারা অকৃতকার্য হয়েছেন তাদের জন্য আমাদের চিন্তা ও উৎকণ্ঠা অনেক বেশি । যদিও এ বছর পাসের হার গতবারের থেকে ভাল তারপরেও এই সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। এ বছর আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ড মিলিয়ে ১০ টি বোর্ডের অধীনে মোট শিক্ষার্থী ছিল ১৩ লক্ষ ৩৬ হাজার ৬২৯ জন। এরমধ্যে কৃতকার্য হয়েছে ৯ লক্ষ ৮৮ হাজার ১৭২ জন আর প্রায় অকৃতকার্য হয়েছেন সাড়ে ৩ লক্ষ ছাত্রছাত্রী। গত বছর সংখ্যা ছিল প্রায় চার লাখ। যা আমাদের মোটেই কাঙ্খিত নয়। কারণ এই পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষাগ্রহণ ও ভাল ফলাফল একজন শিক্ষার্থীর স্বপ্নপূরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
একজন শিক্ষক হিসাবে যখন দেখি ছাত্রছাত্রীরা পড়াশুনা করে ভাল রেজাল্ট করেছে তখন খুব আনন্দিত হই আর যখন খারাপ রেজাল্ট করে তখন খুবই খারাপ অনুভূতি হয়। তখন ভাবনা তৈরী হয় এই সকল অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অবস্থা কি হবে? তাই সকল পাবলিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর বিষয়টি কর্তৃপক্ষের আলাদা ভাবে বিবেচনা করা উচিত । কারণ প্রতিবছরের এই বিশাল সংখ্যার শিক্ষার্থী অনিয়মিত শিক্ষার্থী হিসাবে পরিগণিত হবে এবং তাদের ব্যাপারে কোন প্রতিষ্ঠানের চিন্তাভাবনা থাকবে না, যা সত্যিই দুঃখজনক। সাধারণত দেখা যাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো গতবারের খারাপ ফলাফলের কারণ বিশ্লেষণ করে নতুন শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে নানা পদক্ষেপ নিবে যেমন- টিউটরিয়াল ক্লাস, বিশেষ কøাস, ক্লাস টেস্ট ইত্যাদি। কিন্তু গত বছরের অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের নিয়ে কারও কোন ভাবনা বা পরিকল্পনা থাকবে না। তারা হয়তো নিজ উদ্যোগে চেষ্টা করে কিছুটা ভাল ফলাফল করার চেষ্টা করবে আর অধিকাংশই ঝরে পড়া শিক্ষার্থী হিসাবে পরিসংখ্যানে রেকর্ডভুক্ত হয়ে যাবে।
আমাদের দেশে প্রতিবছর পাবলিক পরীক্ষায় বিশেষ করে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় অনেক ছাত্র-ছাত্রী অকৃতকার্য হয়। তাদের মধ্যে অনেকেই আর পড়াশুনায় ফিরে আসতে পারে না বিভিন্ন কারণে যেমন অকৃতকার্য হওয়ার দরুন তারা দারুনভাবে হতাশাগ্রস্ত থাকে, পড়াশুনায় উৎসাহ ও মনোযোগ হারিয়ে ফেলে এবং প্রাতিষ্ঠানিক তদারকিরও অভাব থাকে। যার ফলে তারা ধীরে ধীরে পড়াশুনার পথ থেকে ছিটকে পড়ে।
এসকল অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষার্থীর অনেকেই রয়েছেন মেয়ে শিক্ষার্থী, তারা একবার পরীক্ষায়ে ফেল করলে অনেক পরিবার তার পড়াশুনার ব্যাপারে আর উৎসাহ দেখায় না, বরং তাকে দ্রুত বিয়ে দিতে চায়। ফলে তার আবার নতুন করে পড়াশুনা করে পরীক্ষা দেয়া অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। ফলে তার আর উচ্চশিক্ষা গ্রহণ সম্ভব হয় না।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এ সকল অকৃতকার্য শিক্ষার্থী কি আমাদের সমাজ ও পরিবারের জন্য বোঝা হয়ে থাকবে, নাকি বিশেষ শিক্ষাদান ও প্রেষণার মাধ্যমে তাদেরকে সম্পদে পরিণত করা যাবে। আজ যদি তাদের দিকে বিশেষ নজর দেয়া না হয় তবে তারা পথভ্রষ্ট হয়ে বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে, মাদকাগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারে বা কোন অসাধুচক্রের সাথে জড়িয়ে পড়তে পারে, যা আমাদের জন্য মোটেই কাঙ্খিত নয়। এ ব্যাপারে কিছু পরামর্শ তুলে ধরলামঃ
প্রথমতঃ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন একটা কোয়ালিটি অ্যাসুয়ারেন্স সেল থাকবে যারা প্রতিবছর যে কোন পাবলিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নের কাজ করবে। দ্বিতীয়তঃ প্রত্যেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তরফ থেকে নিজ নিজ অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পাঠদানের ব্যবস্থা করা। তৃতীয়তঃ শিক্ষার্থীরা যেন পড়াশুনায় উৎসাহ হারিয়ে না ফেলে সেজন্য অভিভাবক, শিক্ষক ও বন্ধুমহলের অনুপ্রেরণা ও সহায়তার হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসতে হবে। চতুর্থতঃ ফেল করা শিক্ষার্থীর অনেকেই মেয়ে শিক্ষার্থী তাই তাদের পড়াশুনা যেন বন্ধ না হয়ে না যায় সেজন্য তাদের পরিবারকে সচেতন করা প্রয়োজনে আর্থিক অনুদান প্রদান করা।তাছাড়া যে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই সেখানে দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেয়া;একই সাথে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা; সৃজনশীল পদ্ধতির সঠিক জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য শিক্ষকসহ সহায়ক কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি কারিগরী ও কর্মমুখী শিক্ষাকে যুগোপযোগি করা। যাতে এই শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ দেশে বিদেশে চাকুরীর সুযোগ পায়। বলাবাহুল্য, শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য স¤পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের জন্য গুণগত শিখন-শিক্ষণের ব্যবস্থা করাও জরুরি। সর্বশেষ, এসব শিক্ষার্থী যদি এই শিক্ষা ব্যবস্থায় উৎসাহ বোধ না করে তাহলে তাদেরকে কারিগরী ও কর্মমুখী শিক্ষায় পাঠদানের ব্যবস্থা করতে হবে প্রভৃতি। তাই এখন সময় এসেছে এসব নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার। সুতরাং পরীক্ষায় ছাত্রছাত্রীরা ভাল ফলাফল করলে আমরা যেমন সাধুবাদ জানাই তেমনি যারা অকৃতকার্য হয়েছে তারা কেন খারাপ ফলাফল করল এবং এসকল শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে তা সঠিক ভাবে বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি। সাথে সাথে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরা যেন সমাজের বোঝা না হয়ে ভাল ফলাফলের মাধ্যমে পরিবার তথা দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে পারে সে ব্যাপারে সঠিক কর্মপরিকল্পনা থাকতে হবে।
মোঃ তারিকুল ইসলাম,

শিক্ষক ও গবেষক ,

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

Latest Articles