আজ- শুক্রবার, ২২শে আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৭ই অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

দেশের উন্নয়নে পর্যটন একটি বহুমাত্রিক ও অনন্য শিল্প

মোঃ তারিকুল ইসলাম : বর্তমান বিশ্বে পর্যটন একটি অপার সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবে পরিচিত। সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণশীল ও বৃহৎ বাণিজ্যিক কর্মকান্ড হিসেবে এ শিল্প বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রতি ১১ জনের মধ্যে ১ জন বর্তমানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পর্যটন পেশার সাথে জড়িত। এ বছর জাতিসংঘ পালন করছে আন্তর্জাতিক টেকসই উন্নয়ন বর্ষ। আর এই ধারণাকে অনুসরণ করে ইউএনডাবলুটওি পালন করছে ইন্টারন্যাশনাল ইয়ার অফ সাবসট্যইনাবিলিটি ট্যুরিজম ।এ বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে “উন্নয়নের জন্য চাই টেকসই পর্যটন”। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ইউএনডাবলুটওি প্রণীত ‘গ্লোবাল কোড অফ এথিক্সস’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আমরা যদি এই ‘গ্লোবাল কোড অফ এথিক্সস’ মেনে চলতে পারি তাহলে বাংলাদেশ টেকসই পর্যটন উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ হতে পারবে। এছাড়া জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজি অর্জনের একটি অনুসরণীয় দেশ হতে পারে।
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ১০০ কোটি, ধরা হচ্ছে যা ২০২০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ১৭০ কোটি। পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে এই বিপুল সংখ্যক পর্যটকের প্রায় ৮৩ শতাংশ ভ্রমণ করবেন এশিয়ার দেশগুলোতে। এছাড়াও বিশ্ব পর্যটন সংস্থার তথ্যমতে, ২০২০ সালের মধ্যে এ শিল্প হতে প্রায় ২৯ কোটি ৭০ লাখ লোকেরও অধিক কর্মসংস্থান হবে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে অবদান রাখবে ১০.৫ ভাগ। বাংলাদেশ যদি এ বিশাল বাজার ধরতে পারে তাহলে পর্যটনের হাত ধরেই বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতি। বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জল। এই শিল্পের সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশেকে সুইজারল্যান্ড,পাতায়া, বালি, অথবা বাংককের মত উন্নত পর্যটন শিল্প হিসেবে গড়ে তোলা যায়। বর্তমানে দেশে পর্যটন শিল্প দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। এদেশের আর্থ-সামজিক উন্নয়নে এই শিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই শিল্পখাতের বিকাশ ঘটে মূলত পঞ্চাশ দশকে এবং ১৯৯৯ সালে পর্যটনকে একটি সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে যুগে যুগে বহু পরিব্রজক ও ভ্রমনপিয়াশু মুগ্ধ হয়েছেন। নয়না ভিরম প্রকৃতিক সৌন্দর্য বৈচিত্রপূর্ণ কৃষ্টি কালচার, গৌরব উজ্জল ইতিহাস আমাদের দেশকে পরিণত করছে একটি অপার সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্পের তীর্থ স্থানে। আমাদের দেশে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার ও পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, এছাড়া রয়েছে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত যেখান থেকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়। শৈবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন, ইনানী সমুদ্র সৈকত, হিমছড়ির ঝর্ণা, রামূর বৌদ্ধ মন্দির, বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক, হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপ, টাঙ্গুয়ার হাওর, টেকনাফ সহজেই পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সবুজ পাহাড়ি অঞ্চল দেখে কেউ কেউ আত্মভোলা হয়ে যায়। সাথে সাথে আমাদের দেশে অনেক ঐতিহাসিক এবং প্রতœতাত্ত্বিক স্থান ও রয়েছে। বগুড়ার মহাস্তানগড়, নওগাঁর পাহাড়পুর, দিনাজপুরের কান্তজীর মন্দির, ঢাকার লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিল, বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ, খান জাহান আলীর মাজার, রাজশাহীর বরেন্দ্র জাদুঘর, কুষ্টিয়ার লালন শাহের মাজার, রবীন্দ্রনাথের কুটিবাড়ির শুধু দেশীয় পর্যটক নয় বরং অনেক বিদেশী পর্যটক ও দর্শণার্থীদের নিকট অত্যন্ত সমান জনপ্রিয় এবং সমাদৃত।
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প উন্নয়নের সম্ভাবনা অপরিসীম। পর্যটন শিল্পের সবটুকু সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ বিশ্বের মডেল হতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশকে সারা বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল কয়েকটি পর্যটন দেশ একটি হিসেবে ভাবা হচ্ছে। ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের এই শিল্প যার নমুনা পাওয়া যায় জিডিপিতে। ২০১০ সালে জিডিপির শতকরা এক দশমিক সাত ভাগ এসেছে পর্যটন থেকে। বর্তমানে সেই অবদান চার দশমিক তিন ভাগ। সরকার টার্গেট করেছে ২০২৭ সালে এই হার শতকরা প্রায় সাত ভাগ হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম এ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১০ শতাংশ এই খাত থেকে আয় করা সম্ভব। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল এ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের মতে, ২০১৩ সালে পর্যটন খাতে ১৩ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এই খাতে ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে ২ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে। যদি তা সম্ভব হয়, তাহলে ২০২৪ সালে মোট কর্মসংস্থানের মধ্যে পর্যটন খাতের অবদান দাঁড়াবে ১ দশমিক ৯ শতাংশ। পর্যটন সংশ্লিষ্টদের অভিমত, এক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন করে বিদেশী পর্যটক আকর্ষণ ও অনুকূল সুবিধা সৃষ্টি করতে পারলেই বিশ্বের দ্বিতীয় দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার থেকে বছরে কমপক্ষে ২০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয় করা সম্ভব।
আমাদের বিপুল সম্ভাবনাময় এই শিল্পকে উন্নত করতে গেলে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কতগুলো উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। প্রথমত, পর্যটন শিল্পের জন্য উচ্চপর্যায়ে একটি গবেষণা সেল গঠন তৈরি করা যার মাধ্যমে এ শিল্পের মান উন্নয়নে সর্বদা কর্মপন্থা প্রণয়ন করবে। দ্বিতীয়ত দেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্যে বিদেশী পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য প্রয়োজন ব্যাপক প্রচার ও উদ্যোগ গ্রহণ করা। তৃতীয়ত, সরকারী বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে জাতীয় পরিকল্পনায় পর্যটন শিল্পকে আগ্রাধিকার প্রদানের পাশাপাশি জাতীয় বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা। এছাড়া ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সুদক্ষ পর্যটন পুলিশ গড়ে তোলা, পরিকল্পিত প্রচারণা চালানো, দেশের ইতবাচক ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি পরিকল্পিত বেসরকারী বিনিয়োগ ও বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও শুধু প্রকৃতির দানের ওপর নির্ভর করে থাকলে এর কাক্সিক্ষত সুফল পাওয়া যাবে না। দেশের আনাচে-কানাচে অরক্ষিত ঐতিহ্যমন্ডিত দর্শনীয় স্থানগুলোকে সংস্কার করা এবং নতুন নতুন পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন করা গেলে প্রচুর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। সুতরাং এই অপার সম্ভাবনাময় এই শিল্পের উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ জরুরি যাতে পর্যটন কেন্দ্রগুলোর আধুনিকায়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং পর্যাপ্ত বিনোদন এর সুব্যবস্থা তৈরি করা । এ ছাড়া সুন্দরবন, কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন, কুয়াকাটা, ছেঁড়া দ্বীপ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকাসহ অন্যান্য সকল পর্যটন স্থানগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো একান্ত আবশ্যক। কক্সবাজারকে উন্নত পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য অবশ্যই সেখানকার বিমান বন্দরকে আধুনিকায়ন করতে হবে।পর্যটন স্থানগুলোয় উন্নত মানের হোটেল, রেস্টুরেন্টের সংখ্যা যেমন বৃদ্ধি করা দরকার তেমনি উন্নত সেবাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাছাড়া এ শিল্পে কর্মরত পর্যটক গাইড সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং দক্ষ ও পেশাদার জনবল তৈরি করাও প্রয়োজন । তাই দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যটন শিল্প স¤পর্কিত দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি কোর্স চালু করা যাতে করে দেশের মধ্যে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা সম্ভব হয়। বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় পর্যটনশিল্পের সংযোজন শুধু আর্থিক সুফলতা বয়ে আনবে না, সেইসঙ্গে প্রান্তিক পর্যায়ে এর সুফল ছড়িয়ে দেবে স্থানীয়দের অংশগ্রহণের মাধ্যমে। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে পর্যটনশিল্প বাংলাদেশের জন্য হয়ে উঠতে পারে উল্লেখযোগ্য হাতিয়ার হিসেবে। এজন্য প্রয়োজন সরকারের উন্নয়ন-ভাবনায় পর্যটনশিল্পকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।
মোঃ তারিকুল ইসলাম, শিক্ষক ও গবেষক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

বিভাগ: অন্যান্য,জাতীয়,টপ নিউজ,ঢাকা বিভাগ,ফিচার,ব্রেকিং নিউজ,মিডিয়া,লাইফ স্টাইল,সারাদেশ