আজ- বুধবার, ২৭শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

spot_img

ওসি মোয়াজ্জেমের গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল করবে কে?

.পরোয়ানা জারির ১৩ দিন পরও গ্রেফতার করা হয়নি ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে। পুলিশ বলছে, ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন পলাতক। বিনা অনুমতিতে তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত। ফেনী পুলিশ বলছে, তার স্থায়ী ঠিকানা হচ্ছে যশোরে আর কর্মস্থল রংপুরে। তাই রংপুর পুলিশই এই গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল করবে। আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, ‘ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন পলাতক থাকায় তাকে খুঁজে পেতে একটু সময় লাগছে। তবে, অপরাধের শাস্তি তাকে পেতেই হবে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।’

এদিকে বিভিন্ন দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, আদালতে জামিন নিশ্চিত করতে না পারলে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ওসি মোয়াজ্জেম দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে পারেন।

প্রসঙ্গত, ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে তার মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী থানায় সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। এরপর অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের নামে নুসরাতের বক্তব্য ভিডিও করেন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। পরে সেই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়েও দেন তিনি। ভিডিও করে তা ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে গত ১৫ এপ্রিল ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা দায়ের করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন। বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ ও মামলার নথি পর্যালোচনা করে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেন গত ২৭ মে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন। ওই গ্রেফতারি পরোয়ানা ফেনী পুলিশ ও রংপুর রেঞ্জের পুলিশ হাতে পেলেও তা কারা তামিল করবে, বিষয়টি নিয়ে চলছে রশি টানাটানি।

এরআগে, গত ৬ এপ্রিল এইচএসসি সমমানের আলিম আরবি প্রথমপত্রের পরীক্ষা দিতে গেলে দুর্বৃত্তরা রাফিকে ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে ও পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১০ এপ্রিল তিনি মারা যান। ওইদিনই সোনাগাজী থানা থেকে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়। এরপর তাকে প্রথমে ফেনীর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নে বদলি করা হয়। কয়েকদিন পর বদলি করা হয় রংপুর রেঞ্জ অফিসে।

পুলিশ সদর দফতরের তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী, গত ৮ মে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে তিনি রংপুর রেঞ্জ অফিসে যোগ দেন।

ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিলের বিষয়ে জানতে চাইলে রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য বলেন, ‘মোয়াজ্জেম হোসেন তো এখন কর্মস্থলে নেই। বিভাগীয় কারণে পুলিশ সদর দফতরে সাক্ষ্য দিতে যাওয়ার কথা বলে আর ফিরে আসেননি। এছাড়া এই পরোয়ানা তো তামিল করবে সোনাগাজী থানা পুলিশ। সেজন্য সেই ওয়ারেন্টের কাগজপত্র ফেনীতে পাঠানো হয়েছে।’

তবে রংপুর থেকে ফেরত পাঠানো ওয়ারেন্ট এখনও হাতে পাননি বলে জানান সোনাগাজী থানার ওসি মাঈন উদ্দিন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফেনীর সোনাগাজী সার্কেলের এএসপি সাইকুল আহমেদ ভুঁইয়া বলেন, ‘তার স্থায়ী ঠিকানা হচ্ছে যশোরে। কর্মস্থল হচ্ছে রংপুরে। সেসব স্থানে গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিলের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছে। তারাই সেটা তামিল করার কথা।’

মামলার তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সদর দফতরের বিশেষ পুলিশ সুপার আহসান হাবিব পলাশ বলেন, ‘ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিলের দায়িত্ব হচ্ছে সোনাগাজী থানার। এটা ওই থানারই করার কথা। তদন্ত সংস্থা হিসেবে আমরা প্রতিবেদন জমা দিয়েছি আদালতে। এখানে পিবিআই’র কিছু করার নেই।’

ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিলের বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার বাদী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন বলেন, ‘ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেফতারে যত দেরি হবে, পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস তত কমতে থাকবে। তাই, যত তাড়াতাড়ি তাকে গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করা হবে, ততই মঙ্গল।’

এ প্রসঙ্গে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক মফিজুর রহমান বলেন, ‘ওসি মোয়াজ্জেমের গ্রেফতারি নিয়ে পুলিশ এক সপ্তাহ ধরে লুকোচুরির পর এখন বলছে তিনি পালিয়ে গেছেন। এতে আমরা হতাশ।’

এএসপি পদমর্যাদায় (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আদালতে জামিন নিয়ে কড়াকড়ির কারণে কিংবা কারাগারে যাওয়ার ভয়ে তিনি গাঢাকা দিয়েছেন। তার দেশ ছেড়ে যাওয়ার কথাও শোনা যাচ্ছে। তবে, সেটা কতটুকু সত্য জানি না। এছাড়া তার কর্মকাণ্ডে গোটা পুলিশ বিভাগ বিব্রত। এ অবস্থায় কেউ তার দায় নেবে না।’

জানতে চাইলে ফেনীর পুলিশ সুপার কাজী মনির-উজ-জামান বলেন, ‘সোনাগাজীর সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের সবশেষ অবস্থান রংপুরে ছিল জানি। সে জন্য তার বিরুদ্ধে জারি হওয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা ৩ জুন রাতে পাওয়ার পর বিশেষ বার্তাবাহকের মাধ্যমে রংপুর রেঞ্জে পাঠানো হয়েছে।’

এদিকে, সাইবার ট্রাইব্যুনালে ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমনের দায়ের করা মামলা তদন্তের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল পিবিআই’কে। তদন্ত শেষে পিবিআই গত ২৭ মে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। ওই দিনই আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন। পরোয়ানা জারির দুই দিন পর ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন হাইকোর্টে আগাম জামিনের আবেদন করেন। আবেদনের ওপর শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে ১১, ১২ ও ১৩ জুন।

নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাটির তদন্তও করে পিবিআই। তদন্ত শেষে ১৬ জনকে অভিযুক্ত করে গত ৩০ মে আদালতে চার্জশিট জমা দেয় তদন্ত সংস্থাটি। আগামীকাল (১০ জুন) ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালে মামলাটির অভিযোগ গঠনে শুনানির জন্য ধার্য আছে।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

Latest Articles